রবিবার, 4 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

কোথা থেকে এলো ঈদ, কীভাবে ইহুদি ও খ্রিস্টান ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত এ উৎসব

হাদিসে এভাবে এসেছে: “রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় আগমন করে দেখলেন, তাদের দুটি দিন আছে, যেদিন তারা খেলাধুলা ও আনন্দ করে..” (সূত্র: সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ১১৩৪) উল্লেখিত দিন দুটি ছিল- নওরোজ ও মেহরগান। মজার বিষয় হচ্ছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র হলেও নিজস্ব জাতিগত স্বকীয়তার অংশ হিসেবে ইরানিরা আজও হাজার বছরের পুরনো এই রীতি রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপন করে। মার্কিন-ইসরায়েলের চলমান হামলার মধ্যেই ইরান সম্প্রতি বড় আয়োজন করে নওরোজ উদযাপন করেছে।

কোথা থেকে এলো ঈদ, কীভাবে ইহুদি ও খ্রিস্টান ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত এ উৎসব
ছবি: গ্রাফিক্স, দ্য ভয়েস২৪.কম

মুসলমানদের সবচেয়ে বড় দুই ধর্মীয় উৎসব- ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এ দুই ঈদ কেবল আনন্দ-উৎসবের দিন নয়; বরং এগুলো গভীর ধর্মীয় বিশ্বাসের রীতি, ভিন্ন আদর্শ ও সংস্কৃতির বিবর্তন এবং সামাজিক সমতার প্রতীক। মানব ইতিহাসের দীর্ঘ এবং চলমান অধ্যায় থেকে কয়েক হাজার বছর পেছনে তাকালে দেখা যায়, এই উৎসবের সাথে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রাচীন ধর্মীয় রীতি এবং বিশেষ করে আব্রাহামীয় অন্যান্য ধর্ম- ইহুদি ও খ্রিস্টধর্মের কিছু উৎসবের সাথে আশ্চর্য সাদৃশ্য রয়েছে।

আব্রাহামীয় ধর্ম

আব্রাহামীয় ধর্ম বলতে সেই একেশ্বরবাদী ধর্মগুলোকে বোঝায়, যেগুলোর ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক সূত্রপাত নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। এসব ধর্মের মূল ভিত্তি এক ঈশ্বরে বিশ্বাস এবং ইব্রাহিম (আ.)-কে তাওহিদের গুরুত্বপূর্ণ পথপ্রদর্শক হিসেবে মানা।

এই ধারার প্রধান ধর্মগুলো হলো ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম এবং ইহুদি ধর্ম। ইসলামে ইব্রাহিম (আ.)-এর পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর বংশধারায় আরব অঞ্চলে এই ঐতিহ্য বিস্তৃত হয়ে সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে পূর্ণতা পায়। অন্যদিকে খ্রিস্টধর্ম ও ইহুদি ধর্ম ইব্রাহিম (আ.)-এর পুত্র ইসহাক (আ.)-এর বংশধারায় বিকশিত হয়ে যথাক্রমে ঈসা (আ.) ও মূসা (আ.)-কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে।

এই ধর্মগুলোকে একত্রে “আব্রাহামীয়” বলা হয় কারণ এদের মধ্যে একেশ্বরবাদ, নবী প্রেরণ, ঐশী কিতাব ও পরকালের বিশ্বাসের মতো মৌলিক মিল রয়েছে। একই শিকড় থেকে উৎপন্ন হলেও সময়ের সাথে এগুলো পৃথক ধর্মীয় রূপে বিকশিত হয়েছে এবং বিশ্ব ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলেছে।

‘ঈদুল ফিতর’ শব্দের অর্থ ও ইসলামে এর সূচনা

দ্বিতীয় হিজরি সনে (৬২৪ খ্রিস্টাব্দে) বদর যুদ্ধের বিজয়ের পর মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর নির্দেশে রমজানের রোজার সংযমের উপহার স্বরুপ শাওয়ালের প্রথম দিনে ঈদুল ফিতর-এর সূচনা হয়, যা জাহেলি যুগের উৎসবের পরিবর্তে আল্লাহপ্রদত্ত আনন্দের দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। রোজা ফরজ হওয়ার বছরই প্রথম এ উৎসব পালিত হয় এবং এটি বদর বিজয়ের আনন্দের সঙ্গেও যুক্ত ছিল।

“ঈদ” শব্দটি আরবি ‘আউদ’ ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ ফিরে আসা বা পুনরাবৃত্তি হওয়া। অর্থাৎ, নির্দিষ্ট সময় পরপর ফিরে আসে এমন আনন্দঘন দিনই ঈদ। ‘ফিতর’ অর্থ রোজা বা সংযম শেষ করা; তাই এটি এক মাসের সিয়ামের পর কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন, এই দিনে রাসূল (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী নামাজের আগে খেজুর বা মিষ্টি খাওয়ার প্রচলন রয়েছে।

ঈদুল আজহা: ত্যাগের ঐতিহাসিক স্মারক

ঈদুল আজহার উৎস নিহিত রয়েছে নবী ইব্রাহিম-এর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায়। আল্লাহর নির্দেশে নিজের প্রিয় পুত্রকে কোরবানি করার প্রস্তুতি নিলে শেষ পর্যন্ত তা পশু কোরবানির মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত হয়। এই ঘটনাই আজকের কোরবানির ঈদের ভিত্তি। হজ ও কোরবানির সঙ্গে সম্পৃক্ত এই উৎসব বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের মধ্যে ত্যাগ, আনুগত্য ও মানবিকতার শিক্ষা ছড়িয়ে দেয়।

অন্যান্য ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক উৎসবের সাথে মিল

হাদিসে বর্ণিত আছে, হিজরতের পর মদিনায় এসে নবী দেখেন, মানুষ বছরে দুটি নির্দিষ্ট দিনে আনন্দ-উৎসব করে। হাদিসে এভাবে এসেছে: “রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় আগমন করে দেখলেন, তাদের দুটি দিন আছে, যেদিন তারা খেলাধুলা ও আনন্দ করে..” (সূত্র: সুনান আবু দাউদ, হাদিস নং ১১৩৪)

এই দুটি দিনকে আরবি সূত্রে বলা হয়, ইয়াওমাইন ইয়ালআবুনা ফিহিমা (দুটি দিন, যেদিন তারা আনন্দ-উল্লাস করত)। ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অধিকাংশ আলেম ও ইতিহাসবিদ মনে করেন, এই দিন দুটি ছিল- নওরোজ ও মেহরগান (মিহরগান)। মদিনার সমাজ ছিল বহু-ধর্মীয়- আরব পৌত্তলিক (মুশরিক), ইহুদি গোত্র, পারস্য-প্রভাবিত কিছু জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণ। এই দুটি উৎসব মূলত পারস্য (সাসানীয়) সংস্কৃতির প্রভাব থেকে আসা এবং আরবদের মধ্যে সংস্কৃতিগতভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে মদিনার কিছু অমুসলিম ও সাধারণ জনগণ এগুলো পালন করত। এগুলো সরাসরি ইহুদি ধর্মীয় উৎসব ছিল না; বরং সাংস্কৃতিক ও ঋতুভিত্তিক উৎসব।

নওরোজ (বসন্ত উৎসব)

খ্রিস্টপূর্ব যুগে প্রাচীন পারস্যে এই উৎসবের উৎপত্তি, জরথুস্ত্র ধর্ম ও রাজকীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল এই ধর্মীয় রীতি। বসন্ত বিষুব (Spring Equinox) উপলক্ষে নতুন বছরের সূচনায় নওরোজ উদযাপিত হতো। এটি ছিল মূলত পুনর্জন্ম, নবজীবন ও আনন্দের উৎসব। মজার বিষয় হচ্ছে, ইসলামি প্রজাতন্ত্র হলেও নিজস্ব জাতিগত স্বকীয়তার অংশ হিসেবে ইরানিরা আজও হাজার বছরের পুরনো এই রীতি রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপন করে। মার্কিন-ইসরায়েলের চলমান হামলার মধ্যেই ইরান সম্প্রতি বড় আয়োজন করে নওরোজ উদযাপন করেছে।

মেহরগান (শরৎ উৎসব)

এটিও পারস্যের প্রাচীন উৎসব। “মিথ্রা” (আলোক ও চুক্তির দেবতা) সম্পর্কিত উৎসবটি ফসল তোলার পর দেবতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের উদ্দেশে পালন করা হতো। ভোজ, সঙ্গীত, নৃত্য, উপহার প্রদান ছিল এ উৎসবের অংশ। অনেকটা বাংলার নবান্ন উৎসবের মতো।

নবী মুহাম্মদ (সা.) এই উৎসবগুলো দেখে বলেন, “আল্লাহ তোমাদের জন্য এ দুই দিনের পরিবর্তে আরও উত্তম দুটি দিন দিয়েছেন- ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা।” (সূত্র: সুনান আবু দাউদ)

এ উৎসবের পরিবর্তে নবী ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহা'কে স্থলাভিষিক্ত করার নির্দেশ দেওয়ার কারণ ছিল- ধর্মীয় ভিত্তির অভাব, নওরোজ ও মেহরগান সাংস্কৃতিক ও বহু-ঈশ্বরবাদী ঐতিহ্যনির্ভর। ইসলামের তাওহিদভিত্তিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

ইহুদি ধর্মে উৎসব: ঐতিহাসিক মিলের সূত্র

ইসলামের ঈদের সঙ্গে ইহুদি ধর্মের কিছু উৎসবের ধারণাগত মিল রয়েছে। ঈদের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ ইহুদি উৎসবগুলো হলো-

পাসওভার: মুক্তির উৎসব পাসওভার ইহুদিদের অন্যতম প্রধান উৎসব, যা নবী মূসা-এর নেতৃত্বে মিসরের ফারাওদের দাসত্ব থেকে মুক্তির স্মরণে পালিত হয়। তাওরাত-এ এর বর্ণনা রয়েছে। এই উৎসবেও পরিবারকেন্দ্রিক ভোজ, কৃতজ্ঞতা ও ঐতিহাসিক স্মরণ গুরুত্বপূর্ণ- যা ঈদুল ফিতরের সঙ্গে কাঠামোগতভাবে মিল রাখে।

ইয়ম কিপুর: আত্মশুদ্ধির দিন। ইয়ম কিপুর-এ উপবাস, তওবা ও পাপমোচনের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি করা হয়। যদিও এটি আনন্দের উৎসব নয়, তবু রোজা ও আত্মিক শুদ্ধির ধারণা ইসলামের রমজানের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

খ্রিস্টধর্মে উৎসব: উপবাস ও আনন্দের ধারাবাহিকতা

ইস্টার: পুনরুত্থান ও নবজীবন। ইস্টার যিশু খ্রিস্টের (ঈসা) পুনরুত্থানের স্মরণে পালিত হয়। এর আগে ৪০ দিনের লেন্ট বা উপবাস পালন করা হয়। উপবাস শেষে আনন্দ—এই কাঠামো ঈদুল ফিতরের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।

ক্রিসমাস: সামাজিক আনন্দের উৎসব। ক্রিসমাস, যিশু- যিনি ইসলামে ঈসা নবী হিসেবে পরিচিত, তাঁর জন্ম উপলক্ষে পালিত হয়। পারিবারিক সমাবেশ, উপহার বিনিময় এবং সামাজিক বন্ধনের দিক থেকে এটি ঈদের সঙ্গে তুলনীয়।

মিল ও অমিল: একটি বিশ্লেষণ

আব্রাহামীয় ধর্মগুলোর উৎসবগুলোর মধ্যে কিছু মৌলিক মিল রয়েছে- ঐশী ঘটনার স্মরণ, উপবাস বা ত্যাগের উপাদান, সমবেত প্রার্থনা, সামাজিক বন্ধন জোরদার। তবে ইসলামে ঈদের বিশেষত্ব হলো- নির্দিষ্ট ইবাদতের (রোজা/হজ) সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক, দান ও সামাজিক ন্যায়বিচারের বাধ্যবাধকতা, আনন্দ ও আধ্যাত্মিকতার সমন্বয়।

ঈদ যেকারণে অন্য সব ধর্মের চেয়ে পূর্ণাঙ্গ এবং আলাদা

ইসলাম পূর্ব উল্লেখিত উৎসবগুলো কোনো ফরজ ইবাদতের ফল ছিল না এবং আধ্যাত্মিক শুদ্ধির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিতও ছিল না; এগুলো মূলত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আনন্দের উপলক্ষ ছিল। এর বিপরীতে ইসলাম ঈদুল ফিতর-কে রোজার সমাপ্তি এবং ঈদুল আজহা-কে হজ ও কোরবানির সঙ্গে যুক্ত করে ঈদকে ইবাদতনির্ভর এক আধ্যাত্মিক অর্জনের দিনে পরিণত করেছে। পাশাপাশি পূর্ববর্তী উৎসবগুলোতে সামাজিক ন্যায়ের বাধ্যতামূলক উপাদান না থাকলেও ইসলামের ঈদে ফিতরা, কোরবানি ও দরিদ্রদের অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে আনন্দকে সামষ্টিকভাবে বণ্টনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপট ইসলামের সংস্কারধর্মী বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরে, নতুন কিছু সৃষ্টি না করে বিদ্যমান সংস্কৃতিকে সংশোধন করে তাওহিদভিত্তিক কাঠামোয় রূপ দেওয়া হয়েছে। মদিনায় নবী মুহাম্মদ (সা.) যে নওরোজ ও মেহরগান উৎসব দেখেছিলেন, সেগুলো ছিল পারস্যপ্রভাবিত সাংস্কৃতিক আয়োজন; ইসলাম এর পরিবর্তে এমন দুটি ঈদ প্রবর্তন করে, যা আনন্দের পাশাপাশি ইবাদত, ত্যাগ, কৃতজ্ঞতা ও সামাজিক ন্যায়ের সমন্বিত প্রতিফলন।

লেখক: সম্পাদক, দ্য ভয়েস২৪.কম

তথ্যসূত্র: 

সুনান আবু দাউদ

সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম

কুরআন

তাওরাত

Encyclopaedia Britannica (Eid, Passover, Easter)

Karen Armstrong, A History of God

F.E. Peters, The Children of Abraham