রবিবার, 4 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

সমাজতন্ত্র ঠেকাতে প্রাচীর হিসেবে গড়ে উঠেছিল ইহুদিবাদ

আজকের দিনে বামপন্থী রাজনীতিবিদ এবং ফিলিস্তিন সংহতি আন্দোলনের ওপর যে ধরনের আক্রমণ আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা কিন্তু নতুন কিছু নয়। অনেক আগে থেকেই জায়নবাদী নেতারা তাদের এই আন্দোলনকে সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের বিরুদ্ধে একটি ঢাল বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর কাছে তুলে ধরেছিলেন।

সমাজতন্ত্র ঠেকাতে প্রাচীর হিসেবে গড়ে উঠেছিল ইহুদিবাদ
লা ফ্রঁস আঁসোমিজ-এর প্রতিষ্ঠাতা জঁ-লুক মেলানশোঁ, ৭ মে ২০২৬ তারিখে ফ্রান্সের মার্সেইতে একটি সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন (মিগেল মেদিনা/এএফপি)

আজকের দিনে বামপন্থী রাজনীতিবিদ এবং ফিলিস্তিন সংহতি আন্দোলনের ওপর যে ধরনের আক্রমণ আমরা দেখতে পাচ্ছি, তা কিন্তু নতুন কিছু নয়। অনেক আগে থেকেই জায়নবাদী নেতারা তাদের এই আন্দোলনকে সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের বিরুদ্ধে একটি ঢাল বা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর কাছে তুলে ধরেছিলেন।

সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি কীভাবে তাদের সুনির্দিষ্ট প্রচারণার মাধ্যমে ব্রিটেনে জেরেমি করবিনের নির্বাচনী বিজয়ের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করা হয়েছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সকে ইহুদিবিদ্বেষী হিসেবে চিত্রায়িত করে এবং তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের অর্থায়ন করে তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। বর্তমানে তারা ফ্রান্সের সমাজতান্ত্রিক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জঁ-লুক মেলঁশঁ-র পেছনে লেগেছে এবং তাঁর বিরুদ্ধেও ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ তুলছে। শুধু তাই নয়, স্পেনের ডানপন্থী বিরোধী দল ‘ভক্স’ (Vox)-কে সমর্থনের মাধ্যমে তারা স্পেনের পেড্রো সানচেজের সমাজতান্ত্রিক সরকারকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আয়ারল্যান্ডের প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ ও আইরিশ সরকারের বিরুদ্ধে লবিং চালাচ্ছে।

প্রগতিশীলদের বিরুদ্ধে জায়নবাদীদের এই কৌশল মোটেও নতুন কিছু নয়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকেই জায়নবাদী আন্দোলন নিজেকে সাম্রাজ্যবাদী স্পনসরদের কাছে সমাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে একটি প্রাচীর বা 'বুলওয়ার্ক' হিসেবে বিপণন করে আসছিল। আর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোও এটিকে সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমকে রুখে দেওয়ার একটি নিখুঁত হাতিয়ার হিসেবেই গ্রহণ করেছিল।

সাম্রাজ্যবাদী ভিত্তি

জায়নবাদের সমাজতন্ত্র-বিরোধী এই তৎপরতার জন্ম হয়েছিল মূলত এই আন্দোলনের সূচনালগ্নেই। ১৮৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে জার্মানির কায়সার (সম্রাট) এবং তাঁর মন্ত্রীদের সঙ্গে আলাপকালে জায়নবাদী সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা থিওডোর হার্জেল জার্মানদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে, জায়নবাদ ইহুদিদের সমাজতন্ত্র থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে। হার্জেল বলেছিলেন, “ইহুদিদের সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে যোগ দেওয়াটা ছিল চরম বোকামি, কারণ সমাজতন্ত্র খুব দ্রুতই তাদের ঝেড়ে ফেলবে।”

হার্জেল আরও যোগ করেছিলেন যে, জার্মান কায়সার তখন বেশ প্রভাবিত হয়েছিলেন যখন তিনি উল্লেখ করেন যে, “ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা শিক্ষার্থীদের সমাজতন্ত্রের পথ থেকে ফিরিয়ে এনেছি।” তাঁর মতে, জায়নবাদ ইহুদিদের বিপ্লবী এবং কায়সার-বিরোধী সংস্থায় যোগ না দিতে উদ্বুদ্ধ করবে, কারণ “আমরা ইহুদিদের বিপ্লবী দলগুলো থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছিলাম।”

১৯২০ এবং ১৯২১ সালে অনুষ্ঠিত কমিন্টার্নের (কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল) দ্বিতীয় ও তৃতীয় কংগ্রেসে জায়নবাদকে স্পষ্ট ভাষায় চিহ্নিত করা হয়েছিল এমন একটি আন্দোলন হিসেবে, যার উদ্দেশ্য হলো “ইউরোপের ইহুদি শ্রমিক শ্রেণীকে শ্রেণীসংগ্রাম থেকে বিচ্যুত করা এবং এটি একটি পেটি-বুর্জোয়া বুর্জোয়া বা বুর্জোয়া-প্রতিক্রিয়াশীল ইউটোপিয়া ছাড়া আর কিছুই নয়।”

তৎকালীন জায়নবাদী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড লয়েড জর্জ ব্রিটিশ যুদ্ধকালীন ক্যাবিনেটের ইস্টার্ন কমিটির কাছে এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছিলেন। সেখানে জেনারেল জর্জ ম্যাকডোনঘ একজন জায়নবাদী কর্মকর্তার সতর্কবার্তা পুনর্ব্যক্ত করে বলেছিলেন যে, “ইহুদিরা যদি ফিলিস্তিনে তাদের দাবি অনুযায়ী অধিকার না পায়, তবে আমরা দেখব সমগ্র ইহুদি সমাজ বলশেভিজমের দিকে ঝুঁকে পড়ছে এবং বিশ্বজুড়ে বিপ্লবকে সমর্থন করছে।”

১৯২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে 'সানডে হেরাল্ড'-এ প্রকাশিত “জায়নবাদ বনাম বলশেভিজম” (Zionism versus Bolshevism) শিরোনামের একটি নিবন্ধে উইনস্টন চার্চিল যেসব ইহুদি নিজেদের দেশের প্রতি অনুগত এবং সেখানকার সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে গেছেন, তাদের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেন। তবে তিনি তাদের রাজনৈতিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক বলে খারিজ করে দেন। চার্চিল মনে করতেন আসল লড়াইটা হচ্ছে জায়নবাদ এবং কমিউনিজমের মধ্যে। তিনি কমিউনিজমকে “আন্তর্জাতিক ইহুদিদের” একটি চক্রান্ত হিসেবে দেখতেন, যা পশ্চিমা খ্রিস্টান সভ্যতাকে ধ্বংস করতে উদ্যত। চার্চিল লিখেছিলেন:

“ইহুদি জাতির রাজনৈতিক ধারণার ক্ষেত্রে জায়নবাদ একটি তৃতীয় ক্ষেত্র তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক কমিউনিজমের সম্পূর্ণ বিপরীতে এটি ইহুদিদের সামনে একটি শক্তিশালী জাতীয়তাবাদী আদর্শ তুলে ধরে। ফিলিস্তিন জয়ের ফলশ্রুতিতে এটি এখন ব্রিটিশ সরকারের ওপর এসে বর্তেছে যে তারা বিশ্বজুড়ে ইহুদি জাতির জন্য একটি বাসস্থান ও জাতীয় জীবনের কেন্দ্র সুরক্ষিত করার সুযোগ ও দায়িত্ব পাবে। জায়নবাদ ইতিমধ্যে রাশিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে একটি বড় নিয়ামক হয়ে উঠেছে, যা বলশেভিক বলয়ে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট ব্যবস্থার সাথে একটি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রভাব হিসেবে কাজ করছে।”

একটি বৈশ্বিক লড়াই

১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরও তাদের এই সমাজতন্ত্র-বিরোধী নীতি অব্যাহত থাকে। যদিও ১৯৪৮ পরবর্তী ইসরাইলের জায়নবাদী নেতৃত্ব ইহুদি বসতিস্থাপনকারীদের জন্য এক ধরনের "সমাজতন্ত্র"— বা আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে, ইহুদিদের জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ববাদী সমাজতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল— তবে তাদের মূল চালিকাশক্তি ছিল তীব্র অ্যান্টি-কমিউনিজম বা কমিউনিজম-বিরোধিতা। আর এই বিরোধিতাই সোভিয়েত-বিরোধী ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ইসরাইলের সমস্ত জোট গঠনের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে ১৯৭০ এবং ১৯৮০-এর দশকে গুয়াতেমালার গণহত্যাকারী ডানপন্থী একনায়কতন্ত্রের প্রতি ইসরাইলের সামরিক সমর্থন, সেইসাথে এল সালভাদর, সমোজার নিকারাগুয়া, পিনোশের চিলি এবং আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তার মতো ডানপন্থী সন্ত্রাসী একনায়কতন্ত্রগুলোকে ইসরাইল যে সহায়তা দিয়েছিল, তা ছিল বিশ্বজুড়ে তাদের সমাজতন্ত্র-বিরোধী প্রচেষ্টারই অংশ।

বর্তমানে ফ্রান্সে তারা যে তৎপরতা চালাচ্ছে, তা আসলে ইসরাইল এবং তার সমর্থকদের দ্বারা পরিচালিত একটি বৃহত্তর বৈশ্বিক লড়াইয়ের একটি অংশ মাত্র। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর চলমান ইসরাইলি গণহত্যার পর থেকে যে সমস্ত সমাজতান্ত্রিক শক্তি ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় অবিচল দাঁড়িয়েছে, মূলত তাদের বিরুদ্ধেই এই যুদ্ধ। ফলস্বরূপ, এই সমাজতন্ত্রীদের সম্পূর্ণভাবে পরাজিত না করা পর্যন্ত ইসরাইল এবং তার সমর্থকদের এই ক্ষোভ ও আক্রমণ প্রশমিত হবে না।

উল্লেখ্য, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডিল ইস্ট আই-এর এই প্রবন্ধটির লেখক জোসেফ মাসাদ নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক আরব রাজনীতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের অধ্যাপক। তিনি বহু গ্রন্থ এবং অ্যাকাডেমিক ও সাংবাদিকতামূলক প্রবন্ধের রচয়িতা। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘কলোনিয়াল এফেক্টস: দ্য মেকিং অফ ন্যাশনাল আইডেন্টিটি ইন জর্ডান’, ‘ডিজায়ারিং আরব্‌স’, ‘দ্য পারসিস্টেন্স অফ দ্য প্যালেস্টাইনিয়ান কোয়েশ্চেন: এসেজ অন জায়োনিজম অ্যান্ড দ্য প্যালেস্টাইনিয়ান্‌স’ এবং অতি সাম্প্রতিক ‘ইসলাম ইন লিবারেলিজম’। তাঁর বই ও প্রবন্ধ এক ডজন ভাষায় অনূদিত হয়েছে।