রবিবার, 4 অক্টোবর 2026
সকল বিভাগ

ফুটবল: স্টেডিয়ামের আলোয় ঢাকা শ্রমের অন্ধকার

ফুটবল! পৃথিবীর সবচেয়ে নান্দনিক খেলা। যে খেলায় বুঁদ হয়ে থাকে গোটা বিশ্ব। কি ইউরোপ, কি এশিয়া, কি আমেরিকা, কী রাশিয়া, সকলকে একসূত্রে গাঁথে ফুটবল। একটা গল্প প্রচলিত আছে, কিংবদন্তি ফুটবলার পেলের খেলা দেখার জন্য ১৯৬৯ সালে নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধ ৪৮ ঘন্টার জন্য থেমে গিয়েছিলো৷ এর নাম ফুটবল৷ এ এক মোহ, এ এক উন্মাদনা যেটা মানে না কোনো সীমা, পরিসীমা, কোনো বয়স, জাত-পাত ভেদ।

ফুটবল: স্টেডিয়ামের আলোয় ঢাকা শ্রমের অন্ধকার
ছবি: গ্রাফিক্স, দ্য ভয়েস২৪

ফুটবল! পৃথিবীর সবচেয়ে নান্দনিক খেলা। যে খেলায় বুঁদ হয়ে থাকে গোটা বিশ্ব। কি ইউরোপ, কি এশিয়া, কি আমেরিকা, কী রাশিয়া, সকলকে একসূত্রে গাঁথে ফুটবল। একটা গল্প প্রচলিত আছে, কিংবদন্তি ফুটবলার পেলের খেলা দেখার জন্য ১৯৬৯ সালে নাইজেরিয়ার গৃহযুদ্ধ ৪৮ ঘন্টার জন্য থেমে গিয়েছিলো৷ এর নাম ফুটবল৷ এ এক মোহ, এ এক উন্মাদনা যেটা মানে না কোনো সীমা, পরিসীমা, কোনো বয়স, জাত-পাত ভেদ। 

ক্রমবর্ধমান ফুটবল বাণিজ্য

একটা সময় ফুটবল ছিলো শুধুই বিনোদন। তার সাথে সাথে ফুটবলাররা আর্থিক সুবিধা ও ভালো পেতেন৷ দিনে দিনে ফুটবলের বাজার বড় হয়েছে। এই বাজারের সাথে যুক্ত হয়েছে আরো নানান অনুষঙ্গ। শুধুমাত্র ইউরোপের ফুটবল ইন্ডাস্ট্রিই কমপক্ষে ৪০ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ। পুরো বিশ্বব্যাপী এই বাজার কমপক্ষে ৬০-৭০ বিলিয়ন ডলারের সমান৷ বিশ্বব্যাপী কমপক্ষে ১ লক্ষ ৩০ হাজার ফুটবলার রয়েছে। ফুটবলের এই বাজার এখন খুব দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটছে। বাজার সম্প্রসারণের সাথে সাথে ফুটবল দর্শনেও পরিবর্তন আসছে।

কোচের আধিপত্য ও বিপরীতমূখী দর্শন

ফুটবলকে বলা হয় কোচেস গেম। অর্থাৎ এখানে কোচই সব। কোচ চাইলে এই গ্রহের সেরা খেলোয়াড়টিকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখতে পারে। প্রয়োজনবোধে তারা তা করেনও। প্রত্যেক কোচের একেকটা আলাদা দর্শন রয়েছে। কারো দর্শন হাই-লাইন ডিফেন্স, কারো দর্শন টোটাল ফুটবল, কারো দর্শন ট্রাস্ট দ্য প্রসেস। আধুনিক যুগের ফুটবল দর্শনে একটা লক্ষণ খুব বেশি দেখা যাচ্ছে সেটা 'গতি'। যে দল যত বেশি প্রেস করতে পারে, যত গতিশীল ফুটবল খেলতে পারে তারা তত সফল হচ্ছে৷ উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনাল চলছে। পিএসজির খেলোয়াড় গত বছরের ব্যালন ডি অর জয়ী উসমান দেম্বেলের উক্তিটা এক্ষেত্রে উদ্ধৃত করা যেতে পারে। 

দেম্বেলে বলেন, "পিএসজি কোচ লুই এনরিকে খেলোয়াড়দের কাছ থেকে প্রেসিং চান৷ আপনি যদি পর্যাপ্ত প্রেস করতে না পারেন তবে আপনার জায়গা হবে বেঞ্চে। এখনকার দিনে এক পজিশনের খেলোয়াড়কে একাধিক পজিশনে দক্ষ হওয়ার ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে। এ এক মরণযুদ্ধ। এখানে আপনার মিলি সেকেন্ড পিছিয়ে পড়ার সুযোগ নেই৷ এ যুদ্ধে মিলি সেকেন্ড পিছিয়ে পড়লেও আপনি হেরে যাবেন৷ খেলোয়াড়রা যেন কোনো মানুষ নয়, তারা একেকটা মেশিন৷ যেই মেশিনের হিসাব কিতাব সব নির্ধারিত। এখানে সিস্টেম ফেইলিউর বলে কিছু হওয়ার সুযোগ নেই।"


ইঞ্জুরি ও পতনের ঝুঁকি

সুইজারল্যান্ড ভিত্তিক জার্নাল MDPI এর এক গবেষণা জার্নালে দেখা যাচ্ছে, আধুনিক ফুটবলে খেলোয়াড়দের খেলার গতি অনেকটাই বাড়ানো হয়েছে৷ খেলোয়াড়দের এখন মাঠে অনেক বেশি পরিমাণ জায়গায় দৌড়াতে হয়। বড় বড় ক্লাবের খেলোয়াড়দের  এখন ৬০ টারও বেশি ম্যাচ খেলতে হয় এবং এ সংখ্যা বেড়েই চলেছে। প্রতি ৮ দিনে একজন খেলোয়াড়কে ৩ টি ম্যাচ খেলতে হয়। এতে পর্যাপ্ত রিকোভারি টাইম সে পাচ্ছে না। ফলে সে দ্রুত মাসল ইঞ্জুরিতে পড়ছে। 

বড় বড় ক্লাবগুলোতে একজন খেলোয়াড় প্রতি সিজনে গড়ে দুইটি ইঞ্জুরিতে পড়ে। ফলে ২৫ জনের একটি স্কোয়াডে আনুমানিক ৫০ টার মত ইঞ্জুরি ঘটে যার ২৮% খেলোয়াড়ের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে হয়ে থাকে। ২০২১-২২ সিজনে  ইউরোপের প্রধান ৫ টি লিগে ইঞ্জুরির ক্ষতির পরিমাণ ছিলো ৬০০ মিলিয়ন ইউরো৷ এই ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে এখন খুবই চমৎকারভাবে খেলোয়াড়দের প্রতিটি পদক্ষেপ মনিটরিং করা হয়। তার শরীর কতটা ধকল সামলাতে পারছে তার প্রতিটি পদক্ষেপ রেকর্ডেড থাকে। এভাবে ওয়ার্কলোড ম্যানেজ করার চেষ্টা করা হয়৷ কিন্তু একজন খেলোয়াড়ের ক্লাবে প্রতিনিয়ত টাইট শিডিউলে খেলা, এরপর আবার তার দেশকে প্রতিনিধিত্ব করার জন্য জাতীয় খেলা- মিলিয়ে এই ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট পর্যাপ্ত হয় না।

উদাহরণস্বরূপ বার্সেলোনার তারকা খেলোয়াড় লামিন ইয়ামালের কথা বলা যায়। লামিন ইয়ামাল তার দেশ স্পেনের হয়ে খেলতে গিয়ে কিছুদিন আগে ইঞ্জুরিতে পড়ে। এতে বার্সেলোনা কোচ হ্যান্সি ফ্লিক প্রচণ্ড রাগান্বিত হন। তার অভিযোগ ছিলো স্পেন জাতীয় দলের কোচ ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট ঠিকমত করে নি৷ অতিরিক্ত লোডের কারণে লামিন ইঞ্জুরিতে পড়েছে। ব্রাজিলের রাফিনিয়ার কথা ও বলা যায়। গুরুত্বহীন এক ফ্রেন্ডলি ম্যাচে রাফিনিয়াকে বিশ্রাম দেওয়ার প্রয়োজনবোধ করে নি কোচ। ফলশ্রুতিতে ইঞ্জুরিতে পড়ে রাফিনিয়া। এসব কিছুই অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফল। একজন খেলোয়াড় যখন ক্লাবের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন তখন তিনি এই শ্রমটা দিতে বাধ্য। এতে শারীরিক, মানসিক উভয় দিকেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বার্সেলোনার খেলোয়াড় রোনাল্ড আরাউহো এখনো মানসিক অবসাদে ভুগছে। 

এছাড়া আধুনিক ট্রেন্ড হচ্ছে বয়স ১৮ হওয়ার আগেই অনেক খেলোয়াড় পুরোদস্তর তারকা বনে যাচ্ছেন৷ খেলে যাচ্ছেন প্রাপ্ত বয়স্কদের মতই। একজন শিশুকে এই পরিমাণ চাপের মধ্য দিয়ে যাওয়াটাকে কি আধুনিক দাসত্বপনা বলা যাবে না?

বাণিজ্যের আড়ালে দাসত্ব

আরেক মজার বিষয় হলো খেলোয়াড় বিক্রি। মানুষকে বিক্রি করা যায় না। বিক্রি করা যায় দাসকে। ক্লাব মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে তাদের খেলোয়াড়কে অন্য ক্লাবে বিক্রি করে৷ যদিও এখানে খেলোয়াড়ের সম্মতিও থাকে। তবুও এটা এক ধরণের পরোক্ষ দাসত্ব। এছাড়াও ক্লাবগুলো ইঞ্জুরি হলে চুক্তি বাতিল করা হবে এমন বিধানও রাখে চুক্তিতে। তার মানে হলো মেশিন যদি অচল হয়ে যায় তাহলে তাকে আর দরকার নাই। ব্যবসার এই প্রতিযোগিতায় মানবিকতা তাহলে কোথায়? ক্লাবগুলো যতই মুখরোচক স্লোগান দিক যেমন You will never walk alone অথবা More than a club দিনশেষে এইসব স্লোগানের পিছনে যে চুক্তির অন্ধকার ক্লজ রয়েছে ঢাকা পড়ে যায়।

এতো গেলো বড় ক্লাব এবং এলিটদের এলিট দাসত্বের কথা। ছোট ক্লাবগুলো?  তারা তো খেলোয়াড়দের ব্যবহার করে ঠিকমত বেতনও দেন না। বাংলাদেশেই তো জাতীয় দলের দুজন খেলোয়াড় এক স্বনামধন্য ক্লাব ছেড়েছে বেতন পান না বলে। 

এর মধ্যে আবার ফিফা বিশ্বকাপে ৩২ দল থেকে ৪৮ দল করেছে। ৬৪ দল করার পরিকল্পনা আছে। এত লম্বা একটা টুর্নামেন্ট খেলার ধকল কতটুকু নিতে পারবে খেলোয়াড়রা সেটা একটা চিন্তার বিষয়। প্রতি বিশ্বকাপের আগেই অনেক তারকা খেলোয়াড় ইঞ্জুরিতে পড়ে তাদের বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ হয়ে যায়৷ এবার দেখা যাবে বিশ্বকাপ চলাকালীন অনেকের বিশ্বকাপ স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে। 

তাই ফুটবলকে হয়তোবা আমরা সরাসরি দাসপ্রথা বলতে পারবো না৷ কারণ দাসপ্রথা আইনিভাবে উনিশ শতকেই বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু শ্রমের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও শোষণের নতুন রূপ আজও বিদ্যমান।